সোমবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১২

ময়মনসিংহের নান্দাইলের জাহাঙ্গীরপুরে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ


জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের দেউলডাঙ্গা গ্রামের জেনি আক্তার নামে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রীর পারিবারিকভাবে বিবাহ ঠিক করেমেয়েটির বাবার নাম আশরাফ উদ্দিন কিন্তু মেয়েটি বিয়েতে রাজী না হওয়ায় তার পাশ্ববর্তি বিকশিত নারীনেত্রী জেসমিন আক্তার এর নিকট মেয়েটি তার বিয়ের কথা বলে বিয়ের দুদিন আগে এবং কান্নাকাটি করতে থাকে
তারপর জেসমিন কয়েকজন সহ ইয়ূথ লিডারের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে এবং মেয়েটির বাড়ীতে গিয়ে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে বোঝাতে থাকেমেয়েটির পরিবার তাকে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে অনড় থাকে জেসমিন আক্তার বোঝাতে ব্যর্থ হলে ইউপি সমন্বয়কারী ডা: মজিবুরের সাথে করে নিয়ে নান্দাইল  প্রেসক্লাবে যায়সাংবাদিক আব্দুল হান্নান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানানউপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি সাথে সাথে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জনানঅতঃপর বিয়ের দিন সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, ২ জন পুলিশ এবং ৬জন প্রেসক্লাবের সাংবাদিক আশরাফ উদ্দিনের বাড়ীতে যানবাড়িতে গিয়ে তারা দেখেন গরু জবাই চলছেবিয়ের সকল  ধরনের আয়োজন শেষবরযাত্রী আসার অপেক্ষায় বিয়ে বাড়ীর লোকজনআশরাফ উদ্দিন প্রশাসনের লোকজন পুলিশ, সাংবাদিক দেখে ভয় পেয়ে যায়সে তাদের লিখিতভাবে মুচলেকা দেয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিয়েটি বন্ধ হয় এবং বর মাঝপথ থেকে ফেরত যায়কিন্তু মেয়েটির বাবা রাতের বেলায় বিয়ে দেবার চেষ্টা চালায়বিকশিত নারীনেত্রী, উজ্জীবক ও ইয়ূথদের প্রচেষ্টায় বিয়েটি দিতে পারেনি
এই বিয়ে বন্ধ হওয়ার ফলে এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়এই বিয়েটি বন্ধ হওয়ার কারণে এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতার সৃষ্টি হয়েছেএরই মধ্যে আরো কয়েকটি বাল্যবিবাহ দেবার উদ্যোগ হয়েছিল কিন্তু এলাকার সচেতনতার কারণে তা ভেসে- গেছেএই বিষয়টি শুধু জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নেই প্রভাব পড়ে নাই পাশ্ববর্তী ইউনিয়ন গুলোতে এর প্রভাব পড়েছে
উল্লেখ্য বর্তমানে মেয়েটি আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে

বিয়ে করবেন? (শুধু মাত্র যারা বিয়ে করতে ইচ্ছুক তাদের জন্য)


আমি জানি এ কথা পড়ার সাথে সাথে অনেকের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে অনেকে আবার আফসোসে মাথা নাড়ছেন আর তাহমিদ তো....
যাই হোক মূল কথায় আসিআপনি কি বিয়ে করতে চান? আপনি হয়তো  ভাবছেন- এ আবার কি রকম কথা অবশ্যই চাইআসলে একজন মানুষ কেন বিয়ে করতে চায়? আমরা মোটামুটি ৫টি কারণ চিহ্নত করতে পারি-
১. শারিরীক
২. মানসিক
৩. পারিবারিক
৪. আর্থিক
৫. আত্মিক
আবার বিয়ে ব্যাপারে আমরা অনেক ফ্যান্টাসিতে ভুগিঅনেক অবিদ্যাতেও ভুগিআসলে বিয়ে একটা খুব সাধারণ ঘটনাআপনার আগেও কটি কটি মানুষ বিয়ে করেছে এবং আপনার পরেও অনেকে করবেযারা বিয়ে করেছে তাদের মধ্যে যেমন হাজারো সফল মানুষ রয়েছেআবার বিয়ে না করা সফল মানুষের লিস্টও অনেক লম্বাঅর্থাৎ আপনার সাফল্য-ব্যর্থতার সাথে বিয়ের কোন সম্পর্ক নেইআপনি আসলে তখনি বিয়ে করবেন, যখন আপনি প্রয়োজন অনুভব করবেন
কাকে বিয়ে করবেন?
বিয়ে আসলে একটা চুক্তিবিয়ে মানে পারস্পারিক আদান প্রদানএই আদান প্রদান ব্যাক্তি পর্যযায়ে, এই আদান-প্রদান পরিবার পর্যায়েবিয়ে মানে দায়িত্ব গ্রহণএ জন্য বিয়ের পাত্র-পাত্রিকে নির্বাচন করতে হবে অনেক সতর্কতার সাথে, যিনি এই দায়ত্ব পালন করতে পারবেনআসলে প্রেম আর বিয়ের মাঝে অনেক পার্থক্য আছেতথাকথিক প্রেমে কোন দায়িত্ব নেইতাই প্রেম যাকে ভালো লাগে তার সাথেই করা যায়, সে দায়িত্ব নিতে পারুক বা না পারুককিন্তু যে সে দায়িত্ব নিতে পারে না তাকে বিয়ে করলে কপালে দু:খ ছাড়া আর কিছু নেই 
আসলে বিয়ের যোগ্য পাত্র-পাত্রী কারা?
এখন যোগ্য পাত্রের সজ্ঞা পাল্টে গেছেএক সময় মেয়ের বাবা খোঁজ করতেন পাত্র সৎ কি নাআর এখন খোঁজ নেয়া হয় পাত্রের উপরি কত! মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিতে চাকরি করে, অঢেল টাকা, অনেক ক্ষমতা এসবই এখন যোগ্যতাআসলে আপনি যদি সুখী হতে চান- তাহলে আপনার উচিৎ হবে অন্য সব কিছুর পাশিপাশি এক জন ভালো মানুষকে খুঁজে বের করা এবং তাকে বিয়ে করাএর ফলে হয়তো আপনার জীবনে সাচ্ছন্দের কিছু অভাব হতে পারে কিন্তু সুখের কোন অভাব হবে না
আবার কেমন মেয়ে বিয়ে করতে হবে এ নিয়ে নবীজী (সা:) এর একটি চমৎকার হাদীস আছে-
কোন নারীকে চারটি যোগ্যতার কারনে বিয়ে করা যায়
১. সম্পদ
২. বংশমর্যাদা
৩. রুপ
৪. গুন
এমন নারী খোঁজ যার গুণ আছঅন্য বিবেচনায় বিয়ে করলে তুমি ক্ষতিগ্রস্থ হবে
                                                                                             -বোখারী
এর পর কি আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে?
আর একটা কথা সুন্দর ছেলে বা মেয়ে কে বিয়ে করতে হবে- এই চিন্তার বিষয়ে আপনাকে অবশ্যই বাস্তব সম্মত চিন্তা করতে হবেবর যদি শাখরুখ খানের মত আর বউ ঐশ্বরীয়ার মত চাইলে খুব মুশকিল 

আরও একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- বিয়ে মানে শুধু দুটি ব্যাক্তি না বরং দুটি পরিবারের মিলনএজন্য বিয়ে সবসময় সম-সাংস্কৃতিক, সম-অর্থনৈতিক, সম-মানসিক এবং সম-সামজিক অবস্থার দুটি পরিবারে হওয়া উচিৎএতে বিয়ে সুন্দর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি কারণ ধরুন, ছলের পরিবার মাটিতে বসে খায়এখন মেয়ের পরিবার যদি টেবিল-চেয়েরে বসে খেতে অভ্যস্ত হয়তাহলে সমস্যা
   আবার যদি মেয়ের পরিবার ধার্মিক ও উদার মনা- কবিতা, গান এসব পছন্দ করেঅপর দিকে ছেলের পরিবার কট্টর তাবলিগসমস্য হবেই
বাবা-মার পছন্দে বিয়ে না নিজের পছন্দে বিয়ে?
বিয়ে যেহেতু  আপনি করছেন- তাই পছন্দ আপনারই হতে হবে, কিন্তু তা পরিবারকে অস্বীকার করে নাআসলে বাবা-মার দোয়া ছাড়া যে বিয়ে তা কখনও পরিপূর্ণ হতে পারে না; সেখানে একটা ফাঁক থকেই যায় 
সব শেষে দেখে শুনে বিয়ে করা কেন প্রয়োজন তা নীচের গল্প পড়লেই বুঝতে পারবেন
দু'জনার নতুন বিয়ে হয়েছেখুব ভাব-ভালোবাসাঅনেক আনন্দে তাদের দিন কাটছেএভাবে এক বছর কেটে গেলস্ত্রী সন্তান-সম্ভবাদীর্ঘ দিনের জন্য মায়ের বাড়ি যাবে দু'জনারই খুব মন খারাপতো যাওয়ার দিন স্বামী তার স্ত্রীকে বিদায় দেয়ার জন্য রেল-ষ্টেশনে এসেছেট্রেন চলতে শুরু করেছেস্ত্রী জানালা দিয়ে মাথা বের করে দেখছেস্বামী স্টেশনে দাড়িয়ে হাত নাড়ছেদুজনার চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়ছেএক সময় ট্রেন দৃষ্টির সীমানার বাইরে চলে গেল
এবার সেই ব্যক্তি খেয়াল করলেন- তার পাশেই আর এক লোক (তার বয়সী) রীতিমত হাউমাউ করে কাঁদছেতার খুব মায়া হলো, সে লোকটির কাছে গিয়ে বললো-" ছি এভাবে কাঁদতে আছেআমারও তো বউ এই ট্রেনে চলে গেল, তাই বলে আমি কি এভাবে কাঁদছিসে তো কিছু দিন পর আবার ফিরে আসবে।"
তার এই কথা শুনে লোকটি কোনমতে কান্না থামিয়ে বললো-" আমার বউতো এই ট্রেনে যায়নি।"
- "তাহলে আপনি কাঁদছেন কেন?"
-"কারণ! আমার বউ সামনের ট্রেনে ফেরত আসছে।" লোকটি আরও জোরে কাঁদতে লাগলো

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের কারণ


বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণঃ-
(১)- অনটনের সংসারে ব্যয় হ্রাস বা আয় বৃদ্ধির তাড়না থাকে প্রায় সকল অভিভাবকের অন্তরে। (ক)ভবিষ্যতে 'কন্যাদায়' যেন বড় খরচের দায় হয়ে না দাঁড়ায় সেকথা মাথায় রেখে অল্পবয়সে বিয়ে সেরে ফেলতে পারলে একটা "খরচের দায়" কমে গেল! (খ)বিপরীতে পুত্রের কর্মসংস্থান কিম্বা বহির্গামী প্রবণতাকে অন্তর্মুখী করে সংসারে আটকানোর জন্য দ্রুত বিয়ে দিতে চানঅভিভাবকদের পছন্দমতে অন্ততঃ ৫/৭ বছরের বয়স ব্যবধান মাথায় রেখে স্বাভাবিকভাবেই ১৬/২০বছরের তরুণের জন্য ১১/১৫ বছরের কিশোরী খোঁজেনতখন ক+খ মিলে গেলে বাল্য বিবাহ আবধারিত হয়ে যায়!
(২) ভবিষ্যতে সংসারের উন্নয়নে আর্থিকভাবে অংশগ্রহন করা ছেলেদের জন্য বাধ্যতামূলক, অথচ মেয়েরা স্বামী/শ্বশুরপক্ষ থেকে হাজারো প্রতিবন্দ্ধকতার সম্মুখীন হয় নিজের আয় পিতামাতার সংসারে ব্যয় করতেসংগত কারণেই অধিকাংশ পিতামাতা ছেলেকে শিক্ষিত ও উপার্জনক্ষম করায় যতটা মনযোগ দেন মেয়ের জন্য ততটা দেননা, বরং তাকে 'বিদায়' করতেই আগ্রহী থাকেন!
(৩) কোনো পিতামাতার এক/একাধিক বড় সন্তান যদি কন্যা হয় তবে তারা বড় হয়ে সংসারের হাল ধরবে এমনটা যেমন পিতামাতা মনে করেন না, তেমনি আমাদের সামাজিক ব্যবস্থাও সে পরিবেশ দেয়না; আবার পিতামাতা অনেক কষ্টে সেটাই করতে চাইলেও বয়সের কারণে একসময় মেয়ের বিয়ে দিতেই হয় এবং তখন মেয়ের আয় থেকে পিতামাতা বঞ্চিত হয়ে যান! দেখা যায় ছোট ছেলেটার এখনো সে বয়স/যোগ্যতা/সামর্থই হয়নি সংসারের হাল ধরার জন্য! কোনো পিতামাতাই চাননা এ অনিশ্চয়তার মুখোমুখী হতে
(৪) ছেলেমেয়েদের পরস্পরের প্রতি উৎপাত: বয়সের একটি অলংঘনীয় অনুসর্গ যৌবনে পদার্পণের কালে বিপরীতের প্রতি আকৃষ্ট হওয়াবাস্তবতায় উভয়ের মধ্যে খুব বেশী ব্যবধান না থাকলেও প্রচার ও সামাজিক দৃষ্টি-ভংগীর কারণে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ছেলেরা 'দোষী' সাব্যস্ত হয়, কিন্তু বিপদে পড়ে মেয়েরাই বেশী পিতামাতা মেয়েকে নিয়ে এ বিপদে পড়তে চাননা, তা মেয়েকে 'বিদায়' করে বিপদমুক্ত থাকতে চেষ্টা করেন
(৫) দাদী-নানী পর্যায়ের বৃদ্ধ আত্মীয়দের "নাতবৌ/নাতজামাই" দেখার (অন্তিম) সখ পূরণের জন্য ও অনেক বাল্য বিবাহ সংঘটিত হয়এটার ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন
(৬) অভিভাবকত্বের সমস্যাঃ পিতামাতার বিচ্ছেদ কিম্বা মৃত্যুর কারণে যে কন্যাশিশু অন্য আত্মীয়ের কাছে ঠাঁই পেয়ে বড় হয় তারা প্রায়ই অযত্নের শিকার হয় এবং কোনোমতে বিদায় করতে পারলেই ঐ আত্মীয় বেঁচে যানআবার কোনো আত্মীয় সন্তানস্নেহে ঐ কন্যাশিশুকে "মানুষ" করতে চেষ্টা করলে এবং মেয়েটির যেকোন বেঠিক আচরণের কারণে তাকে শাসন করলে অন্য আত্মীয়রা ও মেয়েটি নিজেও সেটাকে "অত্যাচার" মনে করতে থাকে, তখন তাকে "মানুষ" করা খুব কঠিণ হয়ে পড়ে সেক্ষেত্রেও অভিভাবক তাকে বিদায় করে বাঁচতে চান
 

বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রতিরোধে সচেতন হউন


বাংলাদেশে যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধিহিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এই যৌতুক প্রথা সবচেয়ে বেশী লক্ষ্য করা যায়তবে সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে এই যৌতুক প্রথা চালু আছে  আর্থসামজিক ধর্মীয় অনুভূতি প্রথাগত ঐতিহ্য বাল্যবিবাহ ও যৌতুককে উৎসাহিত করেছেএক্ষেত্রে ধর্ম বর্ণ গোত্র একই ভাবে প্রবাহমান বৈজ্ঞানিক কোন কারন ছাড়াই বাল্যবিবাহ এদেশে প্রচলিত ছিল এবং আছেঅথচ এই বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্যে প্রায় দেড়শত বছরের অধিককাল ধরে উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশে আইনি কড়াকড়ি বিজ্ঞজনদের উপদেশ, সবকিছু মুখ থুবড়ে পড়ে রইলো নব্য সমাজের চাহিদার কাছেশিল্প, সংস্কৃতি, আর্থিক, ধর্মীয় অনুভূতিকে পরাস্ত করে ল বছরের পরাধীনতার অন্তরালে জেগে উঠা দাসমনোবৃত্তি এর প্রাধান্য লাভ করেছে
ধর্ম বর্ণ গোত্রের ইতিহাস ঐতিহ্য যাই থাকনা কেন সকল গোত্রে ঐ দাসমনোবৃত্তির সফল বিকাশ  লাভ ঘটেছেএ ছাড়া এদেশের নিম্নবর্ণ এবং উপজাতীয়দের মধ্যে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়অতি প্রাচীনকাল থেকে বিয়ের বিষয়ে সকল সম্প্রদায়ের ভিতরে বিয়ের বয়স এবং যৌতুক প্রথা কখনো উল্লেখিত, কখনও অনউল্লেখিতভাবে সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে নিয়ে গেছেআর এই সব বিষয় নিয়ে এই উপমহাদেশেই কিছু বিজ্ঞ মানুষ, দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক এর রোধকল্পে জবীনপাত করেছেন আধুনিক সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে রাজা রামমোহন রায়, জতিন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি নজরুল সবাই তাদের চিন্তা, চেতনায় ও শিল্পে সুষ্ঠু ও কল্যাণময় সমাজ গড়ে তোলার েেত্র নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন
শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসে লক্ষ্য করা যায় গরীব ঘরের দুই কন্যাকে এক পাত্রে সমর্পণ করতে গেলে আশীতিপর বৃদ্ধ বাঙ্গালী পচেক ব্রাহ্মণ বলেছে, একজোড়া বলির পাঁঠার দাম ১৭২ টাকা ফলে দুই কন্যার আয় বুড়ো নাম ঘোচাতে ১৫০ টাকা কেন পণ হিসাবে দেবেন না? এই ছিল হিন্দু সমাজের চিত্র রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তী গল্পেও হৈমন্তীর মতো একটি সম্ভাবনাময় চরিত্রে নায়িকার মৃত্যু হয়েছে যৌতুকের যুপকাষ্ঠে পড়েবর্তমান সমাজে দেশের আইনে কন্যার বিয়ের বয়স ১৮ বছর লিখা থাকলেও বাল্য বিয়ে হচ্ছেযৌতুক গ্রহণে আইন ভঙ্গের অপরাধের কথা থাকলেও অলিখিতভাবে কন্যার পিতাগণ যৌতুকের অত্যাচারে নির্যাতিত হচ্ছেসুদুর অতীতকালে মুসলিম সমাজে বরের পিতারা কন্যার পিতাদের দ্বারা অত্যাচারিত হতেন যৌতুকের জন্যযা সম্প্রতি মালয়েশিয়াসহ এখনও দুই একাটি দেশে প্রচলিত আছেকিন্তু আমাদের পাশাপাশি দুই দেশ ভারত এবং বাংলাদেশের দুই সম্প্রদায়ের মানুষ অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলমান একে অন্যের হয়ে গেল যৌতুকের দাবিতেএবারে কেবল কন্যার পিতাগণই আইনের বাইরে যৌতুকের বলি হয়ে চলেছে
কন্যার বিয়ের বয়স নিয়ে এই দুই সম্প্রদায়ের ধার্য ও ঋণকে কড়াকড়িভাবে মেনে চলার চেষ্টা করা হচ্ছেযেমন হিন্দু শাস্ত্রে মনুর নির্দেশ আছে অষ্টম বর্ষ কন্যার বিয়ে দিলে পিতাÑমাতা স্বশরীরে স্বর্গে যাবেঅপর দিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের বালকÑবালিকাদের বিয়ে দেওয়া যেন পিতাÑমাতার কাছে ফরজ কাজ বলে ধরে নেওয়া হয়েছেভারতীয় সমাজে এখনও বহু সম্প্রদায়ের বাস যেখানে নিম্নবর্ণের বিভিন্ন গোত্রে অন্ধত্ব আরো প্রকটভাবে বাল্যবিয়ে ও যৌতুককে আঁকড়ে ধরে আছেএকই অবস্থা বিরাজ করছে বাংলাদেশেএখানে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কিছু পরিবার রয়েছে যারা তাদের ছেলেÑমেয়েদেরকে অতি অল্প বয়সে বিয়ে দেয়, যৌতুক প্রদান করে

আবার কিছু উচ্চবিত্তের লোক আছে যারা মনোরঞ্জনের জন্য একাধিক বিয়ে করেআবার এমনও লক্ষ্য করা  গেছে এই উপমহাদেশে সৌখিন জমিদাররা নামমাত্র একাধিক বিয়ে করে বাগান বাড়িতে উঠাতেন শত শত সুন্দরী নারীদের তাদের দৈহিক ুধার জন্যেএসব আজ আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এখান থেকেই বাল্যবিবাহের প্রচলন শুরু হয়েছিলমোল্লাতান্ত্রিক প্রায় মুসলমানদের মধ্যে একাধিক বিয়েকে বৈধ বলে ঘোষনা করলেও ধর্মের মুল সত্য অজানাই রয়ে গেছেএই সব বহুবিবাহের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সমাজের বিত্তবানরাই করে থাকেনধর্মের অন্ধ ব্যাখ্যার কারণে স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে স্ত্রীকেও সহমরনে যেতে হয়েএসবের কোনটিই কল্যাণময় সমাজ গঠনের উপাদান হতে পারে নাযারা একাধিক বিয়ে করে তাদের স্ত্রীদের মধ্যে ২/১ জন যে বালিকা থাকে না তা নয়? আবার সপ্তদশ শতকে এমন ঘটনা ঘটেছে যে, বাহ্মণ ঠাকুররা শিশু কন্যাকে বিয়ে করে শ্বশুর বাড়িতে রেখে দিয়েছেএই সব কন্যারা বিয়ের বয়স হলে দেখা গেছে স্বামী দেবতারা এসে উপস্থিত হয়ে স্ত্রীর নাম ধরে ডাকছেবাস্তবে তারা পরিচয় জানে নামেয়েটিও ইতিমধ্যে হয়তোবা বাবা কিংবা চাচা বলে সম্বোধন করেছেনএই ছিল সেই সময়ের চিত্রআর যাই হোক ঐ মেয়েটি ঘরকন্যা হয় নাইবরং তাকে সহমরণের মত নির্মম যন্ত্রনা ভোগ করতে হয়েছেএসব চিত্র থেকে আজ আমরা অনেক দুরে সরে আসলেও বাল্যবিবাহ থেকে সরে আসতে পারিনিবর্তমানে অনেক বাবা মাÑই রয়েছেন যারা বিয়ের সময় যৌতুকের সম্পূর্ণ টাকা প্রদান করতে পারে না
এসব খেত্রে অনেক সময় কয়েক দিন যেতে না যেতে শুরু হয় ঐ মেয়ের উপরে অমানবিক নির্যাতনঅনেক সময় যৌতুকের টাকা অভাবে বিয়ে ভেঙ্গেও যায়অনেকেই অত্যাচার সইতে না পেরে আতœহত্যার পথ বেছে নেয়সম্প্রতি বাল্যবিবাহ ও যৌতুক দিতে না পারার কারণে স্বামীর ঘর ছেড়ে পিতাÑমাতার পরিবারে অবস্থান করছে এমন নারীর অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছেএরা হলো জামেলা খতুন (১৪), রিনা (১৭) শাপলা (১৪), আরজিনা (১৪), মনিকা (১৫), ঝর্ণা (১৫), ছাবিনা (১৬), শেফালি (১২)এছাড়াও একই গ্রামে রয়েছে পান্না (১৫), মলিরানি (১৩), বিউটি ঘোশ (১৫), নীলা ঘোশ (১৫)যে সব ছেলেদের সাথে এই সব মেয়েদের বিয়ে হয়েছে তারা প্রায় অপ্রাপ্ত বয়স্কযেমন জামেলার স্বামী মাইনুল (১৮), শাফলার স্বামী লিখন (১৭), রিনার স্বামী শরিফুল (১৮)আবার ছাদিনার বয়স ১৩ বছর পক্ষান্তরে তার স্বামীর বয়স (২৮) বছর আর একজন স্বামী সিরাজুলের বয়স ২০ বছর এবং তার স্ত্রী সেফালির বয়স ১২ বছরআবার যৌতুক না দিতে পারার কারনে স্বামীর অত্যাচারে আতœহত্যা করেছে এমন নারীর নামও অফুরন্তএমনও
প্রমান মিলেছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানি ইউনিয়নের একই পরিবারে পিতৃহীন দুই বোন শাহেদা (২২) ও সাজেদা (২০) স্বামীকে যৌতুকের টাকা দিতে না পেরে একই দিনে বিষপান করে আতœহত্যা করেছে এদের একজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আনা হলে মেয়েকে একনজর দেখার জন্যে তার বিধবা মা আনোয়ারা ভ্যান ভাড়ার টাকা যোগাড় করতে না পেরে মৃত্যুর পূর্বে তার মেয়ের মুখটিও তিনি দেখতে পাননিএর চেয়ে ঘৃনিত অপরাধ বা করুণ দৃশ্য আর কি হতে পারে? অথচ এসব বাল্যবিবাহ ও যৌতুক বিষয়ে খোঁজ নিলে এই সমস্ত কন্যাদের অভিভাবকরা কেউ কেউ বলেন, অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়েতে খরচ কম অর্থাৎ যৌতুক কম লাগেমেয়ে বড় হলে বা লিখাপড়া বেশি করলে যৌতুকের টাকার অংশ বেশি হয়অথচ যৌতুকের টাকা অংক যে সবই অলিখিত সেটা তারা বুঝেন না
এই ন্যাক্কারজনক যৌতুক প্রথা ও অভিশপ্ত বাল্যবিবাহের নেপথ্যে রয়েছে যে সকল অর্থলোলুপ মোহাবিষ্ট মুখচ্ছবি তাদের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা মানুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব

আমাদের, যাদের হাতে রয়েছে কলম আর মাথায় রয়েছে বিদ্যাবহু যুগের এই পুরোনো ব্যাধিগুলো আমাদের সমাজে সভ্যতার গাঁ উজাড় করেই ক্ষান্ত হয়নি উপরন্ত আবারও মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে আমাদের সুস্থ মনন বিকাশের পুনর্বাসনকে নস্যাৎ করার চক্রান্তেরামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র সমাজকে আঁকড়ে রেখেছিলেন অবিশষ্ট ধ্বংস থেকে সংস্কারের রশি বেঁধে টেনে তুলে ছিলেন কুসংস্কার আর গোঁড়ামীর ভস্মস্তুপএখন এর সফল আলোক সংশেষণ আর পুষ্টি যোগানোর দায়ভার এসে পড়েছে আমাদের কঁধেকিন্তু সেই দায়ভার নিয়ে আমরা সুদীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এসে দাঁড়ায় বিচারপতি দরবারেআয়েশপ্রিয় বিচারপতির ঘুম ভাঙ্গে ভোর সাড়ে এগারোটায়, কিন্তু ততক্ষণে নিয়তির স্পফওয়াচ থেমে যায় থেমে যায়Ñযৌতুকের বেদীর বলি দেয়া মেয়েটির কান্নাঅনেক আর্তনাদের পর থেকে যায় ভাগ্যের সাথে যুদ্ধরত বোনটির আহাজারিমোটা চকচকে আইনের ভলিয়মগুলো আইনজীবীর বুক শেলফ এ তখনও শোভ বর্ধন করে চলে, ক্ষমতাসীনরা তখন উন্নয়নের জোয়ারে দেশকে ভাসিয়ে দিতে চায়সাথে ভেসে যায় এ সকল সাঁতার না জানা কানা কড়িহীন দুস্থ মানুষগুলোনিয়তিও তাদের প্রতি ক্রড় হাসি হাসে আজকের এই বিজ্ঞানের যুগে এসেও গণতান্ত্রিক আবহাওয়া যদি বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রথার নামান্তর হয় তবে আজও আক্ষেপ করে আবার বলতে ইচ্ছে করে
কি বিচিত্র এদেশের নিয়ম
কি বিচিত্রও এদেশের মানুষ
কি বিচিত্র বাংলাদেশ সেলুকাস

বাল্য বিবাহ: একটি অন্ধকার অধ্যায়


‘.. .. এইসব আমি তোকেই দেবো, তোকে দেবো, তোর ছেলেবেলা তোর কাছ থেকে চেয়ে নেবো.. ..বাল্য বিবাহের কথা আসলেই মৌসুমী ভৌমিকের গানের এই লাইনটি খুব মনে পড়েবাল্য বিবাহ কীভাবে নারীর শৈশব-কৈশোর আর স্বপ্নময়তার দিনগুলোকে কেড়ে নেয়, কী অমানবিক মাপজোক করে ঠিক করে দেয় তার চোখের দৃষ্টিসীমানা, গভীর কালো এক পর্দা টেনে দেয় মনের আকাশটাতে, আর সব মিলিয়ে বিষয়টিকে যখন সামগ্রিক রাষ্ট্র আর সামাজিকতার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা হয়, তখন বিষয়টি দাঁড়ায় এক জাতীয় সমস্যা হয়ে, যার প্রতিকারে প্রয়োজন আশু পদক্ষেপযতোই সময় যাচ্ছে, বাঙলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাল্যবিবাহ অত্যন্ত ভয়াবহ একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছেসমস্যার নখর এখন এতোটাই খামছে ধরেছে যে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, বাঙলাদেশে অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের কারণে যে কয়টি ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো বাল্য বিবাহ বাল্য বিবাহের পরিণতিতে শুধু শিশু, অল্পবয়সী নারী বা তার পরিবারই আক্রান্ত হয় না, এতে দেশ হয় অপুষ্টি ও দুর্বল ভবিষ্যত প্রজন্মের উত্তরাধিকারীদেশের উন্নয়নের জন্য যেখানে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেখানে বাল্য বিয়ে ও এর পরিণতি সংক্রান্ত বিষয়ে নিস্পৃহ দৃষ্টিভঙ্গি কোনো সচেতন নাগরিকের কাম্য হতে পারে নাএ বিষয়টিকেই ভাবনার প্রেক্ষণবিন্দুতে রেখে এবারের মূল ফিচারটি যৌথভাবে তৈরি করেছেন মেরীনা চৌধুরী ও গোলাম রসূল মারুফ
একটি দৃশ্যপট, অতঃপর.. ..
মিঠাপুকুর উপজেলার রহম আলীর ছয় ছেলেমেয়ের মধ্যে সবার বড়ো শেফালী, তার বয়স ১০ বছরএখনো বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারেননি বলে গ্রামের মাতবর ডেকে দু মাসের মধ্যে মেয়ের বিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেনএ নিয়ে রহম আলী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েতখন উপায়ন্তর না দেখে ২৫ বছর বয়সী বিপত্মিক পাত্র নাছিরের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করেননাছির যেহেতু গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্ত, তাই পাত্র হিসেবে তাকে বেছে নেয়ার আগে রহম আলী একবারও ভাবলো না বয়স কিংবা বিয়ের জন্য শেফালীর শারীরিকভাবে প্রস্তুত হয়ে ওঠামূলত সমাজও এক্ষেত্রে প্রভাবক হয়েছে, সমাজের নানাস্থানে এরকম বাল্যবিয়ের দৃশ্য চোখে পড়ে, কোনোটা উঠে আসে গণমাধ্যমের পাতায়, আবার কোনোটা হারিয়ে যায়, হাজারো কোলাহলে হারিয়ে যায় বালিকা বধূর কান্না, কখনো বা মৃত্যুর আগের শেষ আর্ত-চিৎকারটিও
বাল্যবিবাহের ইতিহাস
সেই কবে কোন যুগে বাল্য বিবাহের শুরু হয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট ইতিহাস না পাওয়া গেলেও আদি যুগের গোত্র ও পরবর্তীকালে নানাবিধ প্রথা নিঃসৃত ধারণা এ বাল্যবিয়ের ধারণা দেয় এবং এর বিস্তৃতি ঘটে সমাজ-সংসারেষোড়শ শতকের অষ্টম দশকেও সমগ্র উপমহাদেশে বাল্য বিবাহের প্রচলন ছিলো বলে ইউরোপীয় পরিব্রাজকদের বর্ণনায় প্রকাশ পায়আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরীতে তৎকালীন সমাজের বাল্য বিবাহ প্রথার প্রমাণ পাওয়া যায়অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাল্যবিবাহ সম্বন্ধে স্ক্রাফটনের মন্তব্য, “এই উপমহাদেশের ছেলেমেয়েদের শিশুকালে বিয়ে দেয়া হতো১২ বছর বয়সে একজন রমনীর কোলে একটি সন্তান- এটা ছিলো সাধারণ দৃশ্যসে যুগে ৬-৭ বছর বয়সের পর অবিবাহিত নারী ঘরে থাকা মানেই অসম্মানজনক একটি বিষয়অবিবাহিত নারীর বাবা-মা সমাজের সকলের চোখে ছিলো নিন্দনীয় এমনকি সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবেও সেই পরিবারের সঙ্গে সমাজ সম্পর্ক ছেদ করে সম্পূর্ণভাবে তাকে একঘরে করে রাখা হতো, সামাজিকভাবে যা ছিলো অত্যন্ত কঠোর ও অপমানজনকউনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে তৎকালীন প্রাজ্ঞ ও বোদ্ধাজনেরা বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে তীব্র সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেনরাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে একটি গতিশীল সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেনকিন্তু প্রায় এক শতাব্দীকাল অতিক্রম হলেও আমরা আজো বাল্য বিবাহের বদ্ধ শিকল থেকে কতোটুকু মুক্ত হতে পেরেছি?
বাল্যবিবাহ: বাঙলাদেশ প্রেক্ষিত
বেসরকারি সংস্থা ম্যাস লাইন মিডিয়ার এক জরিপে ২০০৭ সালের হিসেবে জানা যায়, সারা দেশে মোট ২০৩টি বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছেএর মধ্যে ১১২ জন শিশু বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছেকিন্তু আশ্চর্য বিষয় হলো এর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে মাত্র ৭টি এবং এ ৭টি বাল্য বিবাহই বন্ধ করা হয়েছেপরের চিত্রগুলো আরো হতাশাব্যঞ্জকজাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের ওয়ার্ল্ড চিলড্রেনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাঙলাদেশের ৬৪ শতাংশ নারীর বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছর হবার আগেই, অন্যদিকে ১৫ থেকে ১৯ বছরেই অন্তঃসত্ত্বা কিংবা মা হয় এক-তৃতীয়াংশঅন্যদিকে বাঙলাদেশে জাতীয় মহিলা আইনজীবী পরিষদের এক রিপোর্টে জানা যায়, সারা দেশে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ কিশোর-কিশোরী রয়েছে, যার শতকরা ১৩ দশমিক ৭ ভাগ মেয়েশিশুএর মধ্যে ৪৭ ভাগ মেয়ে শিশুর বিয়ে ১৯ বছরের আগেই হয়ে যায়বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে ২০ বছর বা তদূর্ধ্বো নারীদের তুলনায় ১৮ বছরের নিচের প্রসূতিদের মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রায় ২-৫ গুণ বেশিঅন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে বাল্য বিয়ের হার সবচেয়ে বেশিএর প্রধান কারণ হিসেবে দারিদ্র্যতাকেই চিহ্নিত করেছেন সমাজবিজ্ঞানী ও আইনজ্ঞগণতাঁরা মনে করেন, দারিদ্র্যতা যেহেতু মানুষের সকল মৌলিক চাহিদাগুলোকে কারারুদ্ধ করে ফেলে, সেহেতু মানুষ তখন প্রয়োজনের কাছে সকল আইনকে জলাঞ্জলি দেয়তাছাড়া শিক্ষার অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বাঙলাদেশের এমন অনেক স্থান আছে যেখানে এখনো শিক্ষার আলো পৌঁছায়নিএতেও বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছেতবে বাল্য বিবাহের দৃশ্য সবচেয়ে ভয়াবহভাবে ধরা পড়ে উত্তরাঞ্চলের রংপুর জেলায়এখনো সেখানে পাঁচ বছরের বালিকাদের সঙ্গে সত্তর বছরের বৃদ্ধের বিয়ের ঘটনা ঘটেঅথচ এ রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামেই জন্ম নিয়েছিলেন নারীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ বেগম রোকেয়াযদিও বাঙলাদেশের সরকার বিয়ের ক্ষেত্রে নারীদের বয়স ১৮ বছর এবং পুরুষের বয়স ২১ বছর ঠিক করে দিয়েছে- তবুও এখানে নানা কারণে প্রতিনিয়ত বাল্য বিবাহের শিকার হচ্ছে নারীরা
বাল্যবিবাহ রোধে আইন
১৯২৯ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুসারে বাল্যবিবাহ বলতে বোঝায়, বাল্যকাল বা নাবালক বয়সে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বিয়েএছাড়া বর-কণে উভয়েরই বা একজনের বয়স বিয়ের দ্বারা নির্ধারিত বয়সের চেয়ে কম বয়সে বিয়ে হলে তা আইনত বাল্যবিবাহ বলে চিহ্নিত হবেএক পরিসংখ্যানে দেখা যায় অধিকাংশ স্থানেই বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের কোনো যথাযথ প্রয়োগ নেইবাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে তিন ধরণের বিয়ে অপরাধ বলে ধরা হয়েছে; এক, প্রাপ্ত বয়স্কের সঙ্গে অপ্রাপ্ত বয়স্কের বিবাহ; দুই, অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়ের বিয়ে; তিন, অপ্রাপ্ত বয়স্ক পাত্র-পাত্রীর অভিবাবক কর্তৃক বিবাহ নির্ধারণ বা বিয়েতে সম্মতি দানএ আইনে স্পষ্ট করে বলা আছে, বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলের বয়স ২১ এবং মেয়ের বয়স ১৮ হওয়া বাঞ্ছনীয়এ আইন অমান্য করলে একমাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় বিধানই হতে পারে
অন্যান্য সমস্যা
বাঙলাদেশে জন্মহার হ্রাসকরণের ক্ষেত্রে প্রধান দুটি অন্তরায় হলো বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে সন্তান ধারণঅল্প বয়সে সন্তান ধারণের ঘটনা এশিয়াতেই সবচেয়ে বেশি ঘটেবাল্যবিয়েতে প্রথম শিকার হয় শিশু, দ্বিতীয় শিকার নারী এবং তৃতীয় শিকার সমাজএর সুদূর প্রসারী ফল প্রকারান্তরে সমগ্র জাতির উপর গিয়ে পড়েবাল্যবিয়ে নিরোধে জন্মনিবন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে বিয়ের সময় জন্ম সনদ প্রদর্শন অতি বাধ্যতামূলক আবশ্যকবাল্য বিবাহে যে সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে তার মধ্যে নিরাপদ মাতৃত্ব অন্যতমনিরাপদ মাতৃত্বের জন্য সঠিক বয়সকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবেএছাড়া নারীর সঠিক সামাজিকীকরণের মাধ্যমে বেড়ে ওঠা এবং পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর সিধান্ত গ্রহণের অধিকার অর্জন, বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় প্রথা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাল্যবিবাহ রোধ করতে হবে
তবুও প্রত্যাশার বাতিঘর
বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে নারী নিজেই সচেতন হয়ে উঠেছেসম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক খবরে জানা যায় বাবা-মা জোর করে অপ্রাপ্ত বয়স্ক, সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাস এক নারীকে নিষিদ্ধ সংগঠন শিবিরের কর্মীর সঙ্গে বিয়ে দিতে চাইলে মেয়ে নিজেই তার প্রতিবাদ করেসনদ অনুযায়ী তার বয়স ১৭ বছর এবং এ বক্তব্য উল্লেখ করে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে বাবা-মাকে উকিল নোটিশ পাঠায় সেই নারীএ পদক্ষেপ সত্যিকার অর্থেই প্রশংসনীয়নারী নিজেই যখন বাল্য বিবাহ সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে, তখন নিশ্চিত নারী মুক্তি লাভ করবে এ ঘৃণ্য অভিশাপ থেকেআর যখন পুরো সমাজ, রাষ্ট্র এ বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠবে, তখন বাল্য বিবাহের আড়ষ্টতা থেকে নারী বেরিয়ে আসবে- এ প্রত্যাশায় আমাদের সবাইকে একসঙ্গে বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করতে হবে
মডেল: ঊষশী, অনন্যা, হিমু
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, আগস্ট ১২, ২০০৯