বাংলাদেশে যৌতুক একটি সামাজিক
ব্যাধি। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এই যৌতুক প্রথা সবচেয়ে বেশী লক্ষ্য করা যায়। তবে সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে এই যৌতুক প্রথা চালু আছে। আর্থসামজিক ধর্মীয় অনুভূতি প্রথাগত ঐতিহ্য বাল্যবিবাহ ও যৌতুককে উৎসাহিত করেছে। এক্ষেত্রে ধর্ম বর্ণ গোত্র একই ভাবে প্রবাহমান। বৈজ্ঞানিক কোন কারন ছাড়াই বাল্যবিবাহ এদেশে প্রচলিত
ছিল এবং আছে। অথচ এই বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্যে প্রায় দেড়শত বছরের অধিককাল
ধরে উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশে আইনি কড়াকড়ি বিজ্ঞজনদের উপদেশ, সবকিছু মুখ থুবড়ে পড়ে রইলো নব্য সমাজের চাহিদার কাছে। শিল্প,
সংস্কৃতি, আর্থিক, ধর্মীয় অনুভূতিকে পরাস্ত করে ল বছরের পরাধীনতার অন্তরালে জেগে উঠা দাসমনোবৃত্তি এর
প্রাধান্য লাভ করেছে।
ধর্ম বর্ণ গোত্রের ইতিহাস ঐতিহ্য যাই
থাকনা কেন সকল গোত্রে ঐ দাসমনোবৃত্তির সফল বিকাশ লাভ ঘটেছে। এ ছাড়া এদেশের নিম্নবর্ণ এবং উপজাতীয়দের
মধ্যে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অতি প্রাচীনকাল থেকে
বিয়ের বিষয়ে সকল সম্প্রদায়ের ভিতরে বিয়ের বয়স এবং যৌতুক প্রথা কখনো উল্লেখিত,
কখনও অনউল্লেখিতভাবে সমাজকে ধ্বংসের দিকে
ঠেলে নিয়ে গেছে। আর এই সব বিষয় নিয়ে এই উপমহাদেশেই কিছু বিজ্ঞ মানুষ,
দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক এর রোধকল্পে জবীনপাত করেছেন। আধুনিক সভ্যতার
বিকাশের সাথে সাথে রাজা রামমোহন রায়, জতিন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র
বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,
কবি নজরুল সবাই তাদের চিন্তা, চেতনায় ও শিল্পে সুষ্ঠু ও কল্যাণময় সমাজ গড়ে
তোলার েেত্র নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।
শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসে
লক্ষ্য করা যায় গরীব ঘরের দুই কন্যাকে এক পাত্রে সমর্পণ করতে গেলে আশীতিপর বৃদ্ধ বাঙ্গালী পচেক ব্রাহ্মণ বলেছে,
একজোড়া বলির পাঁঠার দাম ১৭২ টাকা ফলে
দুই কন্যার আয় বুড়ো নাম ঘোচাতে ১৫০ টাকা কেন পণ হিসাবে দেবেন না? এই ছিল হিন্দু সমাজের চিত্র। রবীন্দ্রনাথের
হৈমন্তী গল্পেও হৈমন্তীর মতো একটি সম্ভাবনাময় চরিত্রে নায়িকার মৃত্যু হয়েছে যৌতুকের যুপকাষ্ঠে পড়ে। বর্তমান
সমাজে দেশের আইনে কন্যার বিয়ের বয়স ১৮ বছর লিখা থাকলেও বাল্য বিয়ে হচ্ছে। যৌতুক গ্রহণে আইন ভঙ্গের অপরাধের কথা
থাকলেও অলিখিতভাবে কন্যার পিতাগণ যৌতুকের অত্যাচারে নির্যাতিত হচ্ছে। সুদুর অতীতকালে মুসলিম
সমাজে বরের পিতারা কন্যার পিতাদের দ্বারা অত্যাচারিত হতেন যৌতুকের জন্য। যা
সম্প্রতি মালয়েশিয়াসহ এখনও দুই একাটি দেশে প্রচলিত আছে। কিন্তু আমাদের পাশাপাশি
দুই দেশ ভারত এবং বাংলাদেশের দুই সম্প্রদায়ের মানুষ অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলমান একে অন্যের হয়ে গেল যৌতুকের দাবিতে। এবারে
কেবল কন্যার পিতাগণই আইনের বাইরে যৌতুকের বলি হয়ে চলেছে।
কন্যার বিয়ের বয়স নিয়ে এই দুই
সম্প্রদায়ের ধার্য ও ঋণকে কড়াকড়িভাবে মেনে চলার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেমন
হিন্দু শাস্ত্রে মনুর নির্দেশ আছে অষ্টম বর্ষ কন্যার বিয়ে দিলে পিতাÑমাতা স্বশরীরে স্বর্গে যাবে। অপর দিকে মুসলিম
সম্প্রদায়ের বালকÑবালিকাদের
বিয়ে দেওয়া যেন পিতাÑমাতার
কাছে ফরজ
কাজ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। ভারতীয় সমাজে এখনও বহু সম্প্রদায়ের বাস যেখানে নিম্নবর্ণের
বিভিন্ন গোত্রে অন্ধত্ব আরো প্রকটভাবে বাল্যবিয়ে ও যৌতুককে আঁকড়ে ধরে আছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে
বাংলাদেশে। এখানে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কিছু পরিবার রয়েছে যারা তাদের
ছেলেÑমেয়েদেরকে অতি অল্প বয়সে বিয়ে দেয়, যৌতুক প্রদান করে।
আবার কিছু উচ্চবিত্তের লোক আছে যারা মনোরঞ্জনের জন্য
একাধিক বিয়ে করে। আবার এমনও লক্ষ্য করা গেছে এই উপমহাদেশে সৌখিন জমিদাররা নামমাত্র একাধিক বিয়ে করে
বাগান বাড়িতে উঠাতেন শত শত সুন্দরী নারীদের তাদের দৈহিক ুধার জন্যে। এসব
আজ আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এখান থেকেই
বাল্যবিবাহের প্রচলন শুরু হয়েছিল। মোল্লাতান্ত্রিক প্রায়
মুসলমানদের মধ্যে একাধিক
বিয়েকে বৈধ বলে ঘোষনা করলেও ধর্মের মুল সত্য অজানাই রয়ে গেছে। এই সব বহুবিবাহের
ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সমাজের বিত্তবানরাই করে থাকেন। ধর্মের অন্ধ ব্যাখ্যার কারণে স্বামীর
মৃত্যুর সাথে সাথে স্ত্রীকেও সহমরনে যেতে হয়ে। এসবের কোনটিই কল্যাণময় সমাজ গঠনের উপাদান
হতে পারে
না। যারা
একাধিক বিয়ে করে তাদের স্ত্রীদের মধ্যে ২/১ জন যে বালিকা থাকে না তা নয়? আবার সপ্তদশ শতকে এমন ঘটনা ঘটেছে যে, বাহ্মণ ঠাকুররা শিশু কন্যাকে বিয়ে করে শ্বশুর বাড়িতে রেখে দিয়েছে। এই সব
কন্যারা বিয়ের বয়স হলে দেখা গেছে স্বামী দেবতারা এসে উপস্থিত হয়ে স্ত্রীর
নাম ধরে ডাকছে। বাস্তবে তারা পরিচয় জানে না। মেয়েটিও ইতিমধ্যে হয়তোবা
বাবা কিংবা চাচা বলে সম্বোধন করেছেন। এই ছিল সেই সময়ের চিত্র। আর
যাই হোক ঐ মেয়েটি ঘরকন্যা হয় নাই। বরং তাকে সহমরণের মত নির্মম যন্ত্রনা ভোগ করতে
হয়েছে। এসব
চিত্র থেকে আজ আমরা অনেক দুরে সরে আসলেও বাল্যবিবাহ থেকে সরে আসতে পারিনি। বর্তমানে অনেক বাবা মাÑই রয়েছেন যারা বিয়ের সময় যৌতুকের সম্পূর্ণ
টাকা প্রদান করতে পারে না।
এসব খেত্রে অনেক সময় কয়েক দিন যেতে না যেতে শুরু হয় ঐ মেয়ের উপরে অমানবিক নির্যাতন। অনেক
সময় যৌতুকের টাকা অভাবে বিয়ে ভেঙ্গেও যায়। অনেকেই অত্যাচার সইতে না পেরে আতœহত্যার পথ বেছে নেয়। সম্প্রতি বাল্যবিবাহ ও
যৌতুক দিতে না পারার কারণে স্বামীর ঘর ছেড়ে পিতাÑমাতার পরিবারে অবস্থান করছে এমন নারীর অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। এরা
হলো জামেলা খতুন (১৪), রিনা
(১৭) শাপলা (১৪), আরজিনা (১৪),
মনিকা (১৫), ঝর্ণা (১৫), ছাবিনা (১৬), শেফালি (১২)। এছাড়াও একই গ্রামে রয়েছে
পান্না (১৫), মলিরানি (১৩),
বিউটি ঘোশ (১৫), নীলা ঘোশ (১৫)। যে সব ছেলেদের সাথে এই সব মেয়েদের বিয়ে
হয়েছে তারা প্রায় অপ্রাপ্ত বয়স্ক। যেমন জামেলার স্বামী মাইনুল (১৮), শাফলার স্বামী লিখন (১৭), রিনার স্বামী শরিফুল (১৮)। আবার ছাদিনার বয়স ১৩ বছর
পক্ষান্তরে তার স্বামীর বয়স (২৮)
বছর আর একজন স্বামী সিরাজুলের বয়স ২০ বছর এবং তার স্ত্রী সেফালির বয়স ১২ বছর। আবার
যৌতুক না দিতে পারার কারনে স্বামীর অত্যাচারে আতœহত্যা করেছে এমন নারীর নামও অফুরন্ত। এমনও
প্রমান মিলেছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানি ইউনিয়নের একই
পরিবারে পিতৃহীন দুই বোন শাহেদা (২২) ও সাজেদা (২০) স্বামীকে যৌতুকের টাকা দিতে না পেরে একই
দিনে বিষপান করে আতœহত্যা
করেছে। এদের একজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আনা হলে
মেয়েকে একনজর দেখার জন্যে তার বিধবা মা আনোয়ারা ভ্যান ভাড়ার টাকা যোগাড় করতে
না পেরে মৃত্যুর পূর্বে তার মেয়ের মুখটিও তিনি দেখতে পাননি। এর
চেয়ে ঘৃনিত অপরাধ বা করুণ দৃশ্য আর কি হতে পারে? অথচ এসব বাল্যবিবাহ ও যৌতুক বিষয়ে খোঁজ নিলে এই সমস্ত কন্যাদের অভিভাবকরা
কেউ কেউ বলেন, অল্প বয়সে
মেয়েদের বিয়েতে খরচ কম অর্থাৎ যৌতুক কম লাগে। মেয়ে বড় হলে বা লিখাপড়া
বেশি করলে যৌতুকের টাকার অংশ বেশি হয়। অথচ যৌতুকের টাকা অংক যে সবই অলিখিত সেটা
তারা বুঝেন না।
এই ন্যাক্কারজনক যৌতুক প্রথা ও অভিশপ্ত
বাল্যবিবাহের নেপথ্যে রয়েছে যে সকল অর্থলোলুপ মোহাবিষ্ট মুখচ্ছবি তাদের ভেতরের ঘুমিয়ে
থাকা মানুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব
আমাদের, যাদের হাতে রয়েছে কলম আর মাথায় রয়েছে বিদ্যা। বহু
যুগের এই পুরোনো ব্যাধিগুলো আমাদের সমাজে সভ্যতার গাঁ উজাড় করেই ক্ষান্ত হয়নি উপরন্ত আবারও মাথা তুলে
দাঁড়াচ্ছে আমাদের সুস্থ মনন বিকাশের পুনর্বাসনকে নস্যাৎ করার চক্রান্তে। রামমোহন
রায়, ঈশ্বরচন্দ্র সমাজকে আঁকড়ে
রেখেছিলেন অবিশষ্ট ধ্বংস থেকে সংস্কারের রশি বেঁধে টেনে তুলে
ছিলেন কুসংস্কার আর গোঁড়ামীর
ভস্মস্তুপ। এখন এর সফল আলোক সংশেষণ আর পুষ্টি যোগানোর দায়ভার এসে
পড়েছে আমাদের কঁধে। কিন্তু সেই দায়ভার নিয়ে আমরা সুদীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এসে দাঁড়ায়
বিচারপতি দরবারে। আয়েশপ্রিয় বিচারপতির ঘুম ভাঙ্গে ভোর সাড়ে এগারোটায়,
কিন্তু ততক্ষণে নিয়তির স্পফওয়াচ থেমে যায় থেমে যায়Ñযৌতুকের বেদীর বলি দেয়া মেয়েটির কান্না। অনেক
আর্তনাদের পর থেকে যায় ভাগ্যের সাথে যুদ্ধরত বোনটির আহাজারি। মোটা চকচকে আইনের ভলিয়মগুলো আইনজীবীর
বুক শেলফ এ তখনও শোভ বর্ধন করে চলে, ক্ষমতাসীনরা তখন উন্নয়নের জোয়ারে দেশকে ভাসিয়ে দিতে চায়। সাথে ভেসে যায় এ সকল সাঁতার না জানা কানা কড়িহীন
দুস্থ মানুষগুলো। নিয়তিও তাদের প্রতি ক্রড় হাসি হাসে। আজকের এই বিজ্ঞানের যুগে এসেও গণতান্ত্রিক আবহাওয়া
যদি বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রথার নামান্তর হয় তবে আজও আক্ষেপ করে আবার বলতে
ইচ্ছে করে।
“ কি বিচিত্র এদেশের নিয়ম
কি বিচিত্রও এদেশের মানুষ
কি বিচিত্র বাংলাদেশ সেলুকাস”।